14/05/2023
"নার্সিংহোম"
মানদা দেবীর আজকে যেমন একদিকে খুব খুশী হয়েছে তেমনি নিজের জীবনের কথা ভেবে বুকের ভিতর টা মুচড়ে উঠছে। কবে থেকে এই বৃদ্ধ দের নার্সিংহোমে মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে আছে,নাঃ বছরের পর বছর কাটতে কাটতে আজ চার বছর হয়ে গেল ,যমরাজ মাঝে মধ্যে দেখা দিয়ে পালিয়ে যায়,যত বলি সবাই তো মুখ ফিরিয়ে নিল,আজ পর্যন্ত তো শুনিনি তুমি কাউকে ভুলে গেছ ? আজকে শুনলাম নাকি" মাতৃদিবস",এইদিনে মা কে ভালবেসে খাইয়ে দাইয়ে উপহার দেয়। কিছু ছেলে মেয়েরা এসে কেক্ আরও অনেক রকম খাবার খাওয়ালো,মা মা করে গান কবিতা পাঠ করলো।বেশ ভাল লাগলো অনেক দিন পর কতগুলো তরুন তরতাজা ছেলেমেয়ের মুখ দেখে নিজেকেও বেশ ফ্রেশ লাগছে। কেউ দিদিমা,কেউ ঠাকুমা বলে ডেকে ডেকে কত আদর।কতদিন এই ডাক শুনিনি।আছে আমার পাচটি সন্তানের কম করে দশ বারটি নাতি পুতি আছে।সবাই উচ্চ শিক্ষীত ,ভালো ভালো চাকরী করে।সেদিক থেকে আমার অনেক গর্ব।অনেকে আবার সেইজন্য আড়ালে আমাকে অহংকারী বলে ,আমি জানি।বড় নাতি টা আমার বড় ন্যাওটা ছিল ।সেই ছোট্টবেলায় থাম্মা থাম্মা করতে করতে এসে দাদু আর আমার মাঝে শুয়ে পড়তো।লব কুশের গল্প শোনাতে হতো তাকে।কতদিন তাকে দেখা তো দূরের কথা গলার আওয়াজও শুনিনি। সে এখন অনেক দূরে সাতসমুদ্র পাড়ে অনেক বড় বাড়ি বানিয়েছে মেম বউ নিয়ে থাকে।শুনেছি সেই নাকি আমার খরচের সিংহভাগ দেয়। তাই এই নার্সিংহোমে যত্ন আত্তি যেটুকু পাই। কথায় বলে না ভাগের " মা",আমি তাই। স্বামী মারা যাবার পর আমাদের মফস্বলের বাড়িটা বিক্রী করা হলো ।ছেলেরা সবাই বিভিন্ন শহরে থাকে।মেয়েটা কাছে থাকতো কিনতু তার শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে সংসার ,আমার দায়িত্ব চার ভাই থাকতে নেবে কেন? সেজ ছেলে ছেলে বৌ আমাকে তার দুকামরার ফ্লাটে খুব সাধা সাধি করে নিয়ে এলো।তার তিন বছরের ছেলে,দুজনে চাকরী করে।আমি শিশুটির কথা ভেবে তাদের সাথে রয়ে গেলাম। ভাগের সামান্য চার লাখ আমার নামে ছিল। তার সুদে আমার ওষুধ,পত্র যা লাগে চলতো।দেখতে দেখতে সাত আঠ বছর কেটে গেল।তার পর দেখলাম কখন যেন আমি সব ছেলেদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে থাকতে লাগলাম.আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের জিগ্যেস নেই ,যার যখন সুবিধে মা কে পোটলা বানিয়ে পাঠিয়ে দাও। কারুর দুটো মাত্র ঘর তাই বাচ্চারা থাকবে কুকুর থাকবে মা থাকবে কই। বড় বৌ নিজেই অসুস্থ ,মনে হয় ভান করে ,খুব তো ঘুরতে যায় । মেজ বৌ এর একটু মায়া দয়া বেশী কিন্তূ সে একা করবে কেন? ছোট জনের তেমন আয় নেই তবুও সেই করতো।সবাই কিছু কিছু ছোট ছেলেকে ইচ্ছে অনিচ্ছেতে দিত। ছোট বৌমা কে অন্য বৌ এরা ঠারে ঠোরে কথা শোনাতে ছাড়তো না। নিজের উপর কেমন যেন ঘেন্না ধরে গেল। একদিন চোখ মেলে দেখি এই নার্সিং হোমে শুয়ে আছি। জানতে পারলাম একমাস হয়গেছে ব্রেন স্ট্রোক
হয়েছিল,এতদিন কোমায় ছিলাম। রোজ অপেক্ষায় থাকতাম বড় খোকা ছোট বাবু মেজ সোনা আমার রাজা নাতি কেউ তো নিয়ে যাবে বাড়ী,নাঃ চোখের জল শুকিয়ে গেল। আমার জন্য কেউ এতটুকু জায়গা ছেড়ে দেবে না। কেউ নিজেদের হাসি খুশী জীবনে এই বিবর্ন জীর্ন শীর্ন মহিলাকে দেখে নিজেদের কঙ্কাল রুপ দেখে শিহরিত হবে না। আমার এখন কোন ওষুধ ডাক্তার চাই না । খোকারা আমার একবার কাছে আয়,ঐ যে এবার সত্যি সত্যি আমার রথ এসেগেছে।ভালো থাকিস।