25/08/2022
তখন কলেজে পড়ি, এক সদ্য বিবাহিত বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছি জনা কয়েক বন্ধু মিলে৷ আড্ডা চলছে, চিৎকার চেঁচামিচি সহকারে৷ বেশ সাজানো গোছানো দু'কামরার নতুন ফ্ল্যাটে। বান্ধবীটির বর এলাকার বেশ পরিচিত ডাক্তার। তিনি বাড়ি নেই, একটু পরে ফিরবেন৷ আমরা যে রুমটাতে আড্ডা দিচ্ছিলাম হঠাৎ তার দরজার সামনে এক বয়স্ক লোক এসে দাঁড়ালেন, কিছুটা ইতস্তত মুখ নিয়ে৷ বান্ধবীটি তাকে দেখেও তেমন একটা পাত্তা দিল না৷ কি মনে করে আমিই বলে ফেললাম,
-কিছু বলবেন, ভেতরে আসুন..
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটি ততোধিক ইতস্ততভাবে রুমে ঢুকলেন৷ যেন অযাচিতভাবে প্রবেশ করে ফেলেছেন৷
- তোমরা বাবুর বন্ধু?
হঠাৎ এরকম প্রশ্ন শুনে আমরা সবাই এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। প্রাথমিকভাবে প্রশ্নটা ডিকোড করতে পেরে আমিই উত্তর দিলাম,
- না, আমরা আপনার বৌমার বন্ধু।
- ওহ, তা ভালো ভালো৷ তোমাদের তো বিয়েতে দেখিনি?
- না মেসোমশায় আমরা আসতে পারিনি, তখন পরীক্ষা চলছিল তো৷ আরে আপনি দাঁড়িয়ে কেন বসুন না।
ভদ্রলোক যেন একটু ভরসা পেলেন, আমারই পাশে বসলেন৷
- তোমার বাড়ি কোথায়?
আমার উত্তর দেওয়ার আগে পাল্টা একটা নির্দেশ শুনলাম,
- বাবা আপনি ও ঘরে যান আমরা একটু গল্প করব..
এই নির্দেশটি আমার বান্ধবীর থেকে গিয়েছিল৷ বেশ কড়া স্বরে৷ নির্দেশটা শুনে বয়ষ্ক ভদ্রলোক উঠেও যাচ্ছি হড়বড়িয়ে। আমিই হাত ধরে বসালাম,
- আরে, মেসোমশায় বসুন তো আপনি, আপনি ওর কথায় কান দেবেন না৷ কত গল্প বাকি আপনার সঙ্গে৷
এরপর বান্ধবীর ফ্ল্যাটের ওই রুমে আমি আর সেই মেসোমশায় গল্প করতে লাগলাম, আমার সেই বান্ধবী ও বাকি বন্ধুরা উঠে আস্তে আস্তে অন্য রুমে চলে গেল৷ মেসোমশায়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা হল, কথায় কথায় জানলাম আমার এক দাদু মেশোমশায়কে পড়িয়েছেন৷ আমাদের পরিবারকে উনি চেনেন৷ বয়স্ক ভদ্রলোকটি গর্ব ভরে আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানালেন কিভাবে একমাত্র ছেলেকে ডাক্তার বানানোর লড়াই লড়েছেন নীজের জীবনের ২৫ টা বছর, অর্থ, পরিশ্রম সবটুকু দিয়ে৷ গত বছর ওঁর স্ত্রী অর্থাৎ ওই বান্ধবীর শাশুড়ি মারা গিয়েছে তারপর গ্রামের বাড়ি ছাড়িয়ে বাবাকে ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে ছেলে। তারপর থেকেই ফ্ল্যাটে একা চুপচাপ একটা রুমে আবদ্ধ থাকেন ভদ্রলোক৷ বুঝলাম ডাক্তার ছেলের সময় নেই, আর বৌমা সময় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না! বেশকিছুক্ষণ কথা বলার পর মেসোমশায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
- যাও তুমি ওই রুমে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করো, আমি একটু শুয়ে পড়ি, বেশিক্ষণ বসা যায় না একভাবে৷ রাতে এখানে খেয়ে যেয়ো৷
মেসোমশায় চলে যেতে বন্ধুরা যে রুমে আছে সেখানে গেলাম, যেতেই আমাকে নিয়ে একপ্রস্থ খিল্লি শুরু হল,
- ওই এলেন সুপুত্র, তা যা না ওই বুড়োটার সঙ্গেই বকবক কর,চলে এলি কেন?
সেদিন খুব ঠান্ডা, শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় ওই বান্ধবীকে বলেছিলাম,
- এরকম বলিস না, এই ফ্ল্যাটটা কেনার জন্য যে টাকা সেটাতে ওই বুড়ো লোকটার গুরুত্বপূর্ণ ২৫ টা বছর লেগে আছে, যেটা উনি তোর স্বামীকে ডাক্তার বানাতে খরচ করেছেন৷ ধর একদল অচেনা ছেলে তোর দাদার অনুপস্থিতিতে তোর বাড়ি গিয়ে তোর বৌদির সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, এরকম সিচুয়েশনে পড়লে তোর বাবা কি করতেন? এটা আমাদের দায়িত্ব ওঁকে বোঝানো যে আমরা তোর ভালো বন্ধু৷ সেটাই করছিলাম৷
মঙ্গলবার অফিসে বসে একটার পর একটা খবর ব্রেকিং লেখাচ্ছি৷ এমন সময় একটি অনামী বাংলা পোর্টালের একটি খবরে চোখ আটকে গেল, 'মৃত স্বামীর চাকরি পেয়ে শাশুড়ির দিকে ফিরেও তাকায়নি, বৌমাকে তলব হাইকোর্টের।' ভেতরের খবরটা পড়ে অবাক হয়ে গেলাম! মনে পড়ে গেল কলেজের বান্ধবীর ফ্ল্যাটে গিয়ে সামনাসামনি হওয়া এই ঘটনাটা!
২০১৪ সালে প্রয়াত হন পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাথমিক শিক্ষক বজ্রদুলাল মণ্ডল। নিয়ম মেনেই তাঁর চাকরি পান ব্রজদুলালের স্ত্রী। সে সময় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্কুল পরিদর্শককে হলফনামা দিয়েছিলেন ব্রজদুলালের স্ত্রী কৃষ্ণাদেবী। সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর শাশুড়ির দেখভাল করার সমস্ত দায়িত্ব নেবেন তিনি। মৃত ব্রজদুলালও বোধহয় এটুকু আশা করতেন তাঁর স্ত্রী-র কাছ থেকে! কিন্তু না! চাকরি পাওয়ার পর সেই যে বাপের বাড়ি গিয়েছেন কৃষ্ণাদেবী আর ফেরেননি৷ না কোনও রকম খোঁজ নিয়েছেন শাশুড়ির৷ বছরের পর বছর গড়িয়েছে শেষমেশ কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন পুত্রহারা মা। কি না তারই বৌমা তাঁকে দেখভাল করুক এই অধিকারটুকু চেয়ে নিতে। কোর্টকে চিঠি পাঠাতে হচ্ছে বৌমাকে উপস্থিত হতে!
একজন ছেলে/মেয়ের শিক্ষক,ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, ক্লার্ক থেকে যে কোনও ধরণের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর বাবা মায়ের কয়েক হাজার না ঘুমনো রাত, কয়েক বছরে কেটে ছেঁটে ছোটো করে রাখা নিজেদের ভালোলাগাগুলো, পুজোয় না নেওয়া নতুন শাড়ি পছন্দের জুতো, জীবনের সবচেয়ে গুরুপূর্ণ ২২-২৫টা বছর। তাই নিজের স্বামী/স্ত্রী-র সফলতার ভাগ নিতে উৎসুক থাকলে তাঁর বৃদ্ধ-বাবা মায়ের এই লড়াইটাকে সম্মান করতে ভালোবাসতে শিখুন প্লিজ।
একটা সময় ছিল যখন ছেলেমেয়েরা ছোট থাকলে বাবা-মা ভয় পেতেন, যদি একা কোথাও বেরিয়ে পড়ে হারিয়ে যায় 'খোকা'
এখন ছেলেমেয়েরা বড় হলে 'হারিয়ে' যাওয়ার ভয়ে ভয়ে থাকেন বাবা-মা...
শে খ র ভা র তী য়।।