07/04/2026
💐💐💐
১৯৪৮ সালের ১২ই নভেম্বর। টোকিওর উপকণ্ঠে এক বিশাল বাগানবাড়িতে তখন থমথমে পরিবেশ, বাইরের কনকনে ঠান্ডা বাতাসের চেয়েও আদালতের ভেতরের আবহাওয়া ছিল অনেক বেশি ভারী। বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো সহ পঞ্চান্ন জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির বিচার চলছে। আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালের সেই বিশাল হলঘরে এগারোজন বাঘা বাঘা জুরি উপস্থিত। তাঁদের কলমের এক খোঁচায় নির্ধারিত হবে আঠাশ জন 'ক্লাস-এ' যুদ্ধাপরাধীর ভাগ্য, যাদের অপরাধ প্রমাণিত হলে একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একের পর এক বিচারক গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করছিলেন—"গিল্টি"... "গিল্টি"... "গিল্টি"। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বজ্রনির্ঘোষে এক ভিন্ন স্বর শোনা গেল—"নট গিল্টি!"
হলঘরে নেমে এল পিনপতন নিস্তব্ধতা। সবার চোখ তখন এক দীর্ঘকায় ভারতীয় বিচারকের দিকে। তিনি ডক্টর রাধাবিনোদ পাল। টোকিও আসার আগে তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। কিন্তু এই আদালতের গুমোট পরিবেশে তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা। তিনি শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, যুদ্ধাপরাধের জন্য কেবল জাপানকে এককভাবে দায়ী করা হবে চরমতম ঐতিহাসিক ভুল। তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য—মিত্রশক্তিও কি আন্তর্জাতিক আইনের সংযম ও নিরপেক্ষতার নীতিমালা লংঘন করেনি? জাপানের আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত উপেক্ষা করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে প্রায় দুই লক্ষাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যার বিচার কে করবে? যদি জাপানের বিচার করতে হয়, তবে বাকিদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
এই অকুতোভয় মানুষটির শিকড় ছিল অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়ার এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে। ১৮৮৬ সালে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি ছোটবেলাতেই পিতৃহীন হয়ে মায়ের সাথে আশ্রয় নিয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তাঁর মেধার দীপ্তি ছিল সূর্যের মতো প্রখর। একদিন এক স্কুল ইনস্পেক্টর তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রধান শিক্ষককে ডেকে শুধু স্কুলেই ভর্তি করাননি, জলপানির ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। সেই শুরু। জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে স্কুল ফাইনাল পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়া এই মানুষটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এসসি এবং পরবর্তীতে আইনে ডক্টরেট করেন। সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি বিষয় বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, "আইন এবং গণিত খুব একটা আলাদা নয়।"
ফিরে আসি টোকিওর সেই ঐতিহাসিক আদালত কক্ষে। ডক্টর পালের সেই বারোশো বত্রিশ পাতা জুড়ে লেখা রায় ছিল বিজয়ী শক্তির দম্ভের মুখে এক সপাটে চপেটাঘাত। সেই রায়ের প্রতিটি পাতায় ছিল আইনের চুলচেড়া বিশ্লেষণ এবং মানবিকতার এক গভীর আবেদন। তাঁর অকাট্য যুক্তির কাছে হার মানতে হয়েছিল অনেক জুরিকে। তাঁর রায়ের প্রভাবে অধিকাংশ জুরি অভিযুক্তদের 'ক্লাস-এ' থেকে 'ক্লাস-বি'তে নামিয়ে আনতে বাধ্য হন, ফলে অনেকেই রেহাই পান নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে। আন্তর্জাতিক আদালতে তাঁর এই নিরপেক্ষ রায় তাঁকে এবং ভারতকে বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি এনে দেয়।
জাপান ভোলেনি এই মহান নিঃস্বার্থ বাঙালি বন্ধুকে। সম্রাট হিরোহিতো একবার বলেছিলেন, “যতদিন জাপান থাকবে, জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।” ১৯৬৬ সালে সম্রাট তাঁকে জাপানের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘কোক্কো কুনশাও’-এ ভূষিত করেন। টোকিও এবং কিয়োটোর দুটি ব্যস্ত রাস্তা আজও তাঁর নামে পরিচিত। জাপানের আইন পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাঁর লেখা সেই ঐতিহাসিক রায়। ২০০৭ সালে জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দিল্লিতে এসে ডক্টর পালের পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যা ছিল সেই কৃতজ্ঞতারই এক নীরব বহিঃপ্রকাশ।
টোকিওর রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে যদি হঠাৎ সুপ্রিম কোর্টের সামনে গাউন পরা এক বিচারকের মূর্তির নিচে চোখ পড়ে, চমকাবেন না। সেখানে লেখা আছে এক বঙ্গসন্তানের নাম। ভারত তো দূর, গোটা পশ্চিমবঙ্গেও হয়তো তাঁর নামাঙ্কিত কিছু নেই, কিন্তু হাজার মাইল দূরে এক বিদেশি জাতির হৃদয়ে তিনি আজও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন। তিনি কোনো যুদ্ধের ময়দানে তলোয়ার ধরেননি, কিন্তু তাঁর কলমের জোর ছিল যেকোনো অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথে একা হাঁটতে হলেও, সেই হাঁটাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এটা জানতাম না… বিস্মৃত কিন্তু এক পরম সত্য ইতিহাস।
SOURCES:
১. Wikipedia : "Radhabinod Pal" ২. Wikipedia : "International Military Tribunal for the Far East"